মেনু নির্বাচন করুন

ঝিকরগাছার ঐতিহ্য-নকশী কাথা

►নকশী কাঁথার গ্রাম পান্থপাড়াঃ নাম তার পান্থপাড়া, নক্সী কাঁথার গ্রাম। যশোর থেকে পাকা সড়ক পথে, পথের দুরত্ব কমিয়ে মাগুরায় গিয়ে মিশেছে। এ সড়ক পথে প্রায় ১৫ কি. মি. এগোনার পর খাজুরা বাজার। বাজার ছাড়িয়ে কিছুদুর পরই লোকালয়। সড়ক পথে প্রায় ১৫ কি.মি এগোনোর পর খাজুরা বাজার। বাজার ছাড়িয়ে কিছুদূর পরই লোকালয়। সড়কের পাশে সবজি ক্ষেত। ইটের ভাটা। পিছনে গ্রাম। পাকা সড়ক থেকে ধুলিমাখা হাঁটা পথ চলে গেছে পান্থ পাড়ায়। আধা কি.মি এগোনোর পর গ্রামের সূচনা। ছায়া ঢাকা গ্রাম। প্রবীণ আম বৃক্ষ এখনো গ্রামের অস্তিত্বকে গ্রামের ঐতিহ্যকে প্রকাশ করেছে। গ্রামে প্রবেশ করলেই এক আভিনব দৃশ্য চোখে পড়বে। আম রঙের ছায়ার পাটি বিছিয়ে গ্রামের গৃহবধুরা কাঁথা সেলাই করছে। ছোট ন্যাংটা শিশুরা মায়ের সূচী কর্মের পাশে পাশে আপন ইচ্ছায় খেলছে। কিংবা এ দৃশ্যও দেখা যায়, গৃহস্থের বাড়ির লাউয়ের মাচার নিচে চলছে কাঁথা সেলাইয়ের কাজ। আর ট্রানজিস্টার বেজেই চলেছে। কোলের শিশু মুখ লুকিয়ে মায়ের কাঁথা সেলাইয়ের ফাঁকে ফাঁকে দুধ খাচ্ছে। যশোর বাঘারপাড়া থানার পান্থ পাড়া গ্রামের এই দৃশ্য কি শীত, কি গ্রীষ্ম সব সময়ের। ছোট গ্রাম। ২০০ পরিবার এ গ্রামে বসবাস করে। বেশীরভাগ মানুষের পেশা কৃষি কাজ। গ্রামের শিক্ষিতের হার খুবই কম। শতকরা ৯০ শতাংশ মানুষ দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। পান্থপাড়া গ্রামের গৃহবধু, কিশোরী, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা এমন ১০০ মহিলা নক্সী কাঁথা সেলাই কাজকে নিজেদের পেশা হিসেবে নিয়েছে। নানারকম বাহারী কাঁথা সেলাই করে এই মহিলারা নিজেদের দীনতাকে হটিয়ে সামনের দিকে এগোবার চেষ্টা করছে। তারাও রঙিন নক্সী কাঁথার মতো ফুল তোলা রঙিন দ্যাখে। আর গুন গুন করে গান গায়। ফোঁড় তোলে। পাঁচ বৎসর আগে গ্রামের চেহার ভিন্ন ছিল। মুখের কথায় গৃহবধূর তালাক হয়ে যেতো। কৃষি জমি বেশীরভাগ পরিবার না থাকায় সব সময়ই দারিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে গ্রামবাসীরা বাঁচার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। মহিলারা কাজ করলে পাপ হবে, মহিলারা ঘরের বাইরে গেলে ইজ্জত চলে যাবে, এমন কথা সব সময়ই মড়ল মাতব্বরা বলতেন। ১৯৯৪ সালে যশোর শহরের একজন সাধারণ মহিলা রহিমা সুলতানা এ গ্রামের পাশেই একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক রহিমা সুলতানা পান্থপাড়া গ্রামের মহিলার সঙ্গে কথা বলেন। তাদের ভিতরের কষ্ট জানার চেষ্টা করেন। আয়োজন করেন ২০ দিনের সেলাই কাজের প্রশিক্ষণের। কাঁথা সেলাইয়ের কাজ। পর্যায়ক্রমে অন্য মহিলারাও এগিয়ে আসে। তারাও শিখে নেয কাঁথা তৈরীর কলাকৌশল। এরপর থেকেই দিশার আর্ডার মতো গ্রামের মহিলারা কাঁথা তৈরী করছে। দিশা কাপড় সুতো সরবরাহ করে। তা দিয়ে মহিলারা কাঁথা সেলাই করে দেয়। এই কাঁথা যশোর, ঢাকায় বিক্রী হয়। কেউ কেউ দিশা থেকে কাঁথা কিনে বিদেশে পাঠায় পান্থপড়ার নক্সীকাঁথা কৃষক বধুর হাত থেকে নানা মাধ্যমে পৌঁছে যায় ইউরোপ আমেরিকায়। সেখানাকার ভদ্রলোকরা এই কাঁথা দেখে বাংলাদেশেকে, বাংলাদেশের গ্রামীণ মহিলাদের শিল্প বোধকে জানবার চেষ্টা করে। ► নক্সী কাঁথার একাল সেকাল : যশোর অঞ্চলের নক্সী কাঁথার অতীত এখনো উজ্জ্বল হয়ে আছে। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ৫০০/৭০০ বছর আগে থেকেই জনপদের মানুষ শীত নিবারণের জন্য নক্সী কাঁথা গায়ে জড়িয়ে থাকতো। গৃহবধুদের হাতে তৈরী এই নক্সী কাঁথার কদর ছিল বিদেশেও। সে সময় তুলো থেকে তৈরী করা সুতো দিয়েই নক্সী কাঁথার আলপনা, ছবি আঁকা হতো। এই সুতো তৈরীর পর নক্সী কাঁথার পুরো বিষয়ের মধ্যে জড়িত ছিল গৃহবধূদের শিল্পী সত্ত্বার যাবতীয় প্রকাশ। এ ছাড়া পুরাতন ব্যাবহৃত শাড়ির পাড়ের সুতো তুলে সেই সুতো দিয়ে তৈরী করা হতো নক্সী কাঁথার। যার চল কোথাও কোথাও এখনো আছে। সতীশচন্দ্র মিত্র তার ‘যশোর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, পাঠান আমলেই যশোর বস্ত্র শিল্পে সমৃদ্ধ ছিল। উৎকৃষ্ট তুলা উৎপাদনের কারণে এই সমৃদ্ধি অর্জন করা সহজ হয়। তাতে দেখা যায়, ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দ এই সময়ে ৭০০ বছর আগেও এই জনপদের বস্ত্র একটি দেখা যায়, ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দ এই সময়ে প্রায় ৭০০ বছর আগেও এই জনপদের বস্ত্র একটি পৃথক স্থান দখল করে নিয়েছিল। সতীশচন্দ্র মিত্র আরো লিখেছেন, স্ত্রী লোকরা কাঁথা সেলাই ও ‘সিকা’ প্রস্তুত করিয়া অন্য দেশকে পরাজয় করত যশোলাভ করিতেন। তার এই লেখায় প্রমানিত হয় শত শত বছর আগেও যশোর এলাকার মহিলাদের হাতে তৈরী নক্সী কাঁথা দেশ-বিদেশের খ্যাতি অর্জন করেছিল। যা আজো অব্যাহত রয়েছে। সেকেলে মহিলা সদস্যরা এ প্রসঙ্গে জানা যায়, গ্রামের গৃহস্থ এমনকি শহুরে বাবুদের পরিবারিক আভিজাত্য। সে সময় পাড়ের সুতো, বিলেতি সুতো দিয়ে মহিলারা মন থেকে হাতি, ঘোড়া, বাঘ, ফুল, সাপ খেলার দৃশ্য ছাড়াও গ্রামীণ নানা চিত্র কঁথায় ফুটিয়ে তুলতো। সাধারণত এসব কাঁথা উৎসব অনুষ্ঠান কিংবা বাড়িতে মেহমান এলে বাক্স থেকে বের করা হতো। তাকে সে সময় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কাঁথা তৈরীর কোনো ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় না। এর পর দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে কাঁথার নির্মাণ শৈলিরও কিছু পরিবর্তন হয়েছে। মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার কারণে কখনো কখনো নক্সী কাঁথা আলোর মুখ দেখতে পায়নি। পাকিস্তানী জামানায় ষাটের দশকে যশোর অঞ্চলে সেলাই কাজের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। যশোরের প্রগতিশীল এক মহিলা আয়েশা সর্দার এই কাজের মূল রূপকার। ১৯৫৫ সালে যশোরের পুরাতন কসবা এলাকায় বেগম আয়েশা সর্দার ‘যশোর মহিলা শিল্প বিদ্যালয় সমাজকল্যাণ সংস্থা নামে একটি সেলাইয়ের স্কুলের দায়িত্ব নিয়ে ‘যশোর স্টিচ’ নক্সী কাঁথার সূচ শিল্পকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন। কথা বলি মোহসেনা আরা চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বললেন, ১৯৫৭ সালে লেখাপড়া শেষে আয়েশা সর্দারের আহবানে সেলাই স্কুলের দায়িত্ব নেই। আমাদের এলাকাতেই শান্তিপুরের কিছু মহিলা বসবাস করতো। তিনি কাজ করতে চায়, সংসার চালানো জন্য। তাজেমা খাতুন নামে এই বিধবা মহিলা জানায়, সে রিপু কাজ জানে। তখন সেই শাল রিপুর ওপর ভরসা রেখে রিপুর প্যাটার্নে লতা পাতা ফুল তোলার কাজ শুরু হয়। পাকিস্তানী ডি এমসি সুতো দিয়ে সিদ্ধিপাশা থানের ওপর নক্সী কাঁথা, ডাইনিং সেট, বেড কভার ছাড়াও শাড়িতে ফুল তোলার কাজে হাতো না। হাঁটুর ওপর রেখে ফুল তোলা হতো। আয়েশা সর্দার, মিসেস আসিয়া এন খোদা, সালেমা খাতুন বিজলী বিশ্বাস এদের মম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের সেলাই স্কুলের নাম দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। খোলা হয় দর্জি বিভাগ, তাঁত বিভাগ। আমাদের তৈরী পণ্য বিক্রির জন্য আয়েশা আপা ঢাকা-চট্টগ্রাম নিয়ে যেতেন। ডিসি, এসটি সাহেবের স্ত্রী এসে পণ্যের প্রশংসা করে কিনে নিতেন। প্রদর্শনীতে আমাদের স্কুলের নক্সী কাজ সব সময় প্রথম স্থান অধিকার করতো। ১৯৭১ সালের পর আমি পুরোপুরিভাবে সেলাই স্কুলের দায়িত্ব গ্রহণ করি। এর পর ১৯৯০ সালের দিকে রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। মোহসেনা আরা চৌধুরী ডলি আপার এখন বয়স হয়েছে। কিন্তু এখনো তিনি মাঝে মধ্যে ফুল তোলেন। অদ্ভুত সে সব সূচ শিল্প। ডলি আপা সেলাই কাজের স্মৃতিচারণ করে বললেন, মাধবী লতা, গোলাপ বাগান এসব ডিজাইনে শোভা কোনো দিনই স্মৃতিচারণ করে বললেন, মাধবী লতা, গোলাপ বাগান এসব ডিজাইনে শোভা কোন দিনই স্মৃতি থেকে মোছা যাবে না। মূলত এই সেলাই অঞ্চলটির কারণেই বাণিজ্যিকভাবে নক্সী কাঁথা তৈরীর কাজ বাড়ি বাড়ি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আশির দশকে বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান তাদের ঋণ কর্মসূচির পাশাপাশি গ্রামের মহিলাদের নক্সী কাঁথাসহ অন্যান্য সেলাই কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে নক্সী কাঁথা তৈরী করে দেশ-বিদেশে বাজারজাত করা শুরু করে। বাঁচতে শেখা, জাগরণী চক্র, আরআরসি, ব্রাক, দিশা ছাড়া এমন অনেক এনজিওর অধীন এখন যশোর জেলার বিভিন্ন গ্রামের কমপক্ষে ১ লাখ মহিলা সেলাই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য লড়াই করছে। পান্থপাড়া, মনুরাপুর সহ যশোর বাঘারপাড়া ও সদর থানার মহিলাদের দিয়ে কাঁথা সেলাই স্কুল খুলে মহিলাদের দিয়ে নক্সী কাঁথা তৈরীর কাজ শুরু করেন। এখন এই প্রতিষ্ঠানের আয়তন বেড়েছে। যশোর জেস টাওয়ারে রয়েছে দিশার নিজস্ব শো রুম। নক্সী কাঁথার সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলি রহিমা সুলতানার সঙ্গে। তিনি বললেন, যশোরের কাঁথার সমস্যা ও দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু বাজারজাত মূল্য সমস্যা। ঢাকা আর যশোর ছাড়া কোথাও কাঁথা বিক্রি হয় না। ঢাকার দোকানীরা বাকিতে কিনতে চায়। আমাদের পক্ষে বিদেশে কাঁথা বিক্রি হয় না। ঢাকার দোকানীরা বাকিতে কিনতে চায়। আমাদের পক্ষে বিদেশে কাঁথা পাঠানো সম্ভব নয়। সরকারী ভাবে বিদেশে কাঁথা রপ্তানিতে কোন সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায় না। হাজার হাজার মহিলা কাঁথা সেলাই কাজে যুক্ত থেকে তারা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কাজেই এদের কথা বিবেচনা করে আমাদের উৎপাদিত কাঁথা বিদেশ পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলে আমরা এই মহিলাদের পারিশ্রমিক বাড়াতে পারবো। আমরাও লাভবান হবো। ► নক্সী কাঁথার ভিতরের খবর : নক্সীকাঁথা তৈরীর জন্য প্রয়োজন কাপড় আর সুতা। সাধারণত মার্কিন, লাল শালু, কিংবা কালো কাপড় ব্যবহার করা হয়। এই তিন রঙের কাঁথার কদর বেশী। সূতি এসব কাপড়ের ভেতরে অন্য কাপড় দিয়ে কাঁথা পাতা হয়। কাঁথা পাতার পর নির্দিষ্ট শিল্পীরা কাঁথার ওপর নক্সা আঁকে। হাতি, মযুর, পালকী এই তনি নামের নক্সার কাঁথাই বেশী দেখা যায়। নক্সা আকাঁর পর সেলাই কাজ শুরু হয়। চার থেকে ছয়জন মহিলা এক সঙ্গে বসে কাঁথা ...সেলাই করে। বড় পাঁচ হাত সাত হাত কাঁথা সেলাই করতে প্রতিদিন গড়ে ছয় ঘন্টা শ্রম দিলেও সময় লাগে ২০ থেকে এক মাস। স্পেশাল কাঁথা তৈরীতে আরো সময়ের প্রায়োজন। কাঁথার জন্য বিদেশ থেকে আমদানিকৃত স্লিকি পেটি সুতো ব্যবহার করা হয়। এই পেটি সুতোর দাম প্রতি পেটি ১২/১৪ টাকা। বাজারে নানা রঙের স্লিকি সুতো কিনতে পাওয়া যায়। কাঁথার মজুরী দেওয়া হয় প্রতিটির জন্য ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা। কাপড়, আঁকা, ধোলাই সুতো সব মিলিয়ে একটি বড় কাঁথা তৈরী খরচ পড়ে ৩ হাজার টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা। বাজারে এ কাঁথার মূল্য ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। তবে এর কম দামেও কাঁথা কিনতে পাওয়া যায়। সে কাঁথার কাজ কম। এখন বেশী মূল্যের কারণে বড় নক্সার আদলে ছোট কাঁথা তৈরী করা হচ্ছে। এসব কাঁথা শোপিস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর দাম ৩০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা। যশোরের নকশি কাঁথা আমাদের অহংকার, আমাদের গৌরবের প্রতীক। কৃতজ্ঞতাঃ নকশী কাঁথা,দিশা(NGO),রহিমা সুলতানা Edited & Posted by: #JOY


Share with :
Facebook Twitter